ত্রিপুরার রাবার শিল্প

বিশাল বাধা! লজিস্টিক সঙ্কটে ত্রিপুরার রাবার শিল্প-এর ভবিষ্যৎ

ভারত সরকারের ‘লুক ইস্ট’ নীতির অধীনে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল রাজ্য ত্রিপুরা। প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদনে ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সত্ত্বেও, রাজ্যটির নিজস্ব রাবার-ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখনও অধরা। এর মূল কারণ হল— দুর্বল লজিস্টিক পরিকাঠামো। এটি কেবল বিনিয়োগকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না, সেই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ত্রিপুরার রাবার শিল্প-এর প্রবৃদ্ধিকেও গুরুতরভাবে ব্যাহত করছে।


ত্রিপুরার রাবার শিল্প: প্রবৃদ্ধির পথে প্রধান অন্তরায়গুলি

ত্রিপুরা প্রতি বছর ১.১৬ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদন করে। এই বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, রাজ্যটি আজ পর্যন্ত একটিও বড় রাবার-ভিত্তিক শিল্প, যেমন— একটি টায়ার উত্পাদন ইউনিট, স্থাপন করতে পারেনি। রাবার বোর্ডের আধিকারিকদের মতে, এর নেপথ্যে একাধিক লজিস্টিক ও পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নরূপ:

  • অ-রাবার উপাদানের অভাব: টায়ার বা টিউব উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৭০ শতাংশ অ-রাবার উপাদান ত্রিপুরায় স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় না। এর ফলে, এই উপাদানগুলিকে রাজ্যের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়।
  • উচ্চ উৎপাদন খরচ: রাবার বোর্ডের জয়েন্ট রাবার প্রোডাকশন কমিশনার সালি এন (Sali N) জানিয়েছেন, বাইরের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতার কারণে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই উচ্চ ব্যয় বিনিয়োগকারীদের ত্রিপুরায় কারখানা স্থাপন থেকে নিরুৎসাহিত করে।
  • সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট: বর্তমানে ত্রিপুরার পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার বোধজংনগর শিল্পাঞ্চলে কেবল একটি মাত্র রাবার থ্রেড উত্পাদন ইউনিট চালু রয়েছে। বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠার অভাব, বিশেষ করে টায়ার কারখানার স্বপ্ন তাই এখনও অপূর্ণ।
  • তুলনামূলকভাবে ছোট বাজার: যদিও ত্রিপুরায় রাবারের উৎপাদন বিপুল, তবে এককভাবে একটি বৃহৎ টায়ার কারখানা চালু রাখতে যে পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন, ত্রিপুরার বার্ষিক উৎপাদন তার তুলনায় কম হতে পারে। একটি বড় কারখানা কয়েক মাসের মধ্যেই গোটা রাজ্যের উৎপাদন নিঃশেষ করে দিতে পারে। এই সীমাবদ্ধতাও বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলে।
  • সরকারি উদ্যোগের অভাব নিয়ে সমালোচনা: ত্রিপুরা রাজ্য রাবার উৎপাদক সমিতি (Tripura Rajya Rubber Utpadak Samity বা TRRUS)-এর সচিব প্রণব দেবরায় রাজ্যের উৎপাদন সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পায়নের উদ্যোগ না নেওয়ায় রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, কৃষকরা উচ্চ মানের রাবার শীট উৎপাদন করলেও, সেখানে মূল্য সংযোজনের (value addition) কোনো উদ্যোগ নেই।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনাম শিল্পায়নের স্থবিরতা

লজিস্টিক বাধা ত্রিপুরার রাবার শিল্প-এর প্রবৃদ্ধিতে বাধা দিলেও, রাবার চাষ রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

এই শিল্পের ইতিবাচক দিকগুলি হলো:

  • গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি: রাবার চাষ গ্রামীণ এলাকায় কৃষকদের জন্য একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস নিশ্চিত করেছে, যা গ্রামগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে।
  • কৃষকদের বাজার সুবিধা: রাবার চাষিদের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা উৎপাদিত পণ্যের জন্য অগ্রিম অর্থও পান।
  • বর্ধিত বৃক্ষরোপণ: মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশনের অধীনে ত্রিপুরা ইতিমধ্যেই ৪৭,৭৪৬.৮৪ হেক্টর জমিতে রাবার বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন করেছে। এটি ভবিষ্যতে কাঁচামালের সরবরাহ আরও বাড়াবে।

ত্রিপুরার রাবার শিল্প-কে পুনরুজ্জীবিত করার পথ: সমাধান এবং উদ্যোগ

শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক নীতিগত হস্তক্ষেপ এবং পরিকাঠামোর উন্নয়ন হলেই ত্রিপুরার রাবার শিল্প উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি প্রধান ম্যানুফ্যাকচারিং কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

  • যৌথ উদ্যোগ: রাবার বোর্ড এবং অটোমোটিভ টায়ার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ATMA) উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে ৩০,০০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে নতুন রাবার চাষ এবং পুরনো বাগানে নতুন করে চারা রোপণের জন্য একটি পাঁচ বছর ব্যাপী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
  • লজিস্টিক পরিকাঠামো উন্নয়ন: শিল্পের মূল চাহিদা হলো— পরিবহন এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নতি করা। উন্নত রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং সীমান্তের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে সহজ বাণিজ্য পথ খুলে গেলে অ-রাবার উপাদান আমদানির খরচ কমতে পারে।
  • নীতির পরিবর্তন: বিনিয়োগকে আকর্ষণ করার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা উচ্চ উৎপাদন খরচের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ভর্তুকি বা কর ছাড়ের মতো সুবিধা দিতে পারে।
  • মূল্য সংযোজন ইউনিট স্থাপন: ছোট এবং মাঝারি আকারের মূল্য সংযোজনকারী ইউনিট স্থাপনে উৎসাহ দিতে হবে, যা কৃষকদের উৎপাদিত কাঁচামালকে প্রক্রিয়াকরণ করে লাভ বাড়াতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে বলা যায়, বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও শুধুমাত্র পরিকাঠামোগত বাধার কারণে ত্রিপুরার রাবার শিল্প তার পূর্ণ ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। এই বাধাগুলি অতিক্রম করতে পারলে, ত্রিপুরা কেবল তার নিজস্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে না, সেই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভারতের রাবার শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতেও সফল হবে।

SHARE

Discover more from RastriyaSamachar24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One thought on “বিশাল বাধা! লজিস্টিক সঙ্কটে ত্রিপুরার রাবার শিল্প-এর ভবিষ্যৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *