আগরতলা, ৬ নভেম্বর, ২০২৫ — রাজ্যে মাদক বিরোধী অভিযানে আবারও বড়সড় সাফল্য পেল ত্রিপুরা পুলিশ। একটি দিনের মধ্যেই উদয়পুরে দুটি পৃথক অভিযানে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর এক কনস্টেবল সহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সফল তল্লাশিতে বাজেয়াপ্ত হওয়া হেরোইন এবং ব্রাউন সুগারের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৬.৫ লক্ষ টাকা। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, রাজ্যে মাদকের চোরাচালান চক্র কতটা সক্রিয় এবং ত্রিপুরার মাদক চক্র কীভাবে সরকারি বাহিনীর ভেতরেও নিজেদের জাল বিস্তার করার চেষ্টা করছে।
ত্রিপুরা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান মাদক পাচারকারীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ভবিষ্যতেও কঠোরভাবে বজায় থাকবে।
প্রথম ঘটনা: গোকুলপুরে ত্রিপুরার মাদক চক্রের জাল
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল বুধবার সকালে। পুলিশের কাছে গোপন সূত্রে খবর আসে যে, গোকুলপুর এলাকায় কিছু ব্যক্তি মাদক নিয়ে লেনদেনের চেষ্টা করছে। এই খবরের ভিত্তিতেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
- অভিযান পরিচালনাকারী: উদয়পুর মহকুমা পুলিশ আধিকারিক (SDPO)-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল এই সফল অভিযানটি চালায়।
- গ্রেপ্তারকৃতরা: তল্লাশির সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় দুই যুবককে— মিঠুন চক্রবর্তী ও যতন দেবনাথ।
- বাজেয়াপ্ত সামগ্রী: তাদের দখল থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৩৫ গ্রাম হেরোইন-সদৃশ মাদকদ্রব্য।
- মূল্য: এই মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকা।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে রাধাকিশোরপুর থানায় নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস (NDPS) আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এসডিপিও জানান, উদ্ধারকৃত মাদকের উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত চলছে।
দ্বিতীয় ঘটনা: রেলপথে বিএসএফ জওয়ান সহ ত্রিপুরার মাদক চক্রের পাচার প্রচেষ্টা
একই সন্ধ্যায় উদয়পুর রেল স্টেশনে ঘটে আরও এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এক্ষেত্রে নজরদারি ও সতর্কতার কারণে পাচারের একটি বড়সড় চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হয়।
- স্থান ও পরিবহন: উদয়পুর রেল স্টেশন। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের মাধ্যমে পাচারের চেষ্টা চলছিল। মাদকগুলি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এনে সাব্রুম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
- গ্রেপ্তারকৃতরা: এই ঘটনায় মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়— সাজিমুল ইসলাম, ফরিদ আখতার, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন সালীম উদ্দিন, যিনি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ১২১ নম্বর ব্যাটালিয়নের একজন স্যানিটেশন কর্মী এবং শান্তিরবাজারে নিযুক্ত ছিলেন। ত্রিপুরার মাদক চক্র যে কত গভীরে প্রবেশ করেছে, এটি তার এক উদ্বেগজনক প্রমাণ।
- বাজেয়াপ্ত সামগ্রী: তাদের কাছ থেকে দশটি প্যাকেটে ভরা প্রায় ১২৮ গ্রাম ব্রাউন সুগার উদ্ধার করা হয়।
- মূল্য: বাজেয়াপ্ত হওয়া ব্রাউন সুগারের বাজারমূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা বলে অনুমান করা হয়েছে।
এই ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসডিপিও দেবান্জলি রায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হৃষিকেশ জে. দেশাই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সকল অভিযুক্তকে এনডিপিএস আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় সরকারি নিরাপত্তা কর্মীর জড়িত থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং পুরো ত্রিপুরার মাদক চক্র-কে আঘাত হানার জন্য একটি বড় সুযোগ।
কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ এবং ত্রিপুরার মাদক চক্রের বিরুদ্ধে বার্তা
পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দুটি ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের আরও তথ্য জানতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই অভিযানগুলো প্রমাণ করে যে, ত্রিপুরা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ে কতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
- মোট গ্রেপ্তার: দুটি অভিযানে সবমিলিয়ে ৫ জন।
- মোট বাজেয়াপ্ত: প্রায় ১৬৩ গ্রাম মাদক (হেরোইন ও ব্রাউন সুগার)।
- মোট মূল্য: প্রায় ৬.৫ লক্ষ টাকা।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, রাজ্যে কোনও মূল্যে মাদক ব্যবসা চলতে দেওয়া হবে না। সমাজের প্রতিটি স্তরে ত্রিপুরার মাদক চক্র-এর শিকড় উপড়ে ফেলতে এই ধরনের ধারাবাহিক ও আকস্মিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের এমন অবৈধ কাজে জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাগুলি কেবল একটি সাফল্য নয়, এটি একটি বার্তা— ত্রিপুরায় মাদকের কারবার আর নিরাপদ নয়। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা এবং পুলিশের তৎপরতায় ভবিষ্যতে ত্রিপুরার মাদক চক্র পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হবে বলে আশা করা যায়।
Discover more from RastriyaSamachar24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.